আমরা অনেকেই নদীতে বা পুকুরে সাঁতার কাটি। সাঁতার কাটতে যেয়ে অনেকে ভাল সাঁতার কাটতে পারে
আবার অনেকে ডুবে যায়। পানিতে লোহা ডুবে যায় অথচ লোহার তৈরি জাহাজ ভাসে। জাহাজ ভর্তি
মালামাল নিয়েও জাহাজ সাগরের পানিতে ভেসে চলে। কেন এমন হয়? কোন্ বস' ভাসে কোন্টি ডুবে
যায়। তাছাড়া আমরা যখন বালতি দিয়ে পানি উঠাই তখন যে ওজন অনুভব করি বালতিটি যখন পানিতে
ডুবানো থাকে তখন তা থেকে হালকা মনে হয়। আমরা জানি পদার্থের ওজন আছে এবং চাপ প্রয়োগ
করে। তরল পদার্থের ওজন আছে এবং তরল পদার্থও চাপ প্রয়োগ করে। পানিতে জাহাজ ভাসে, নৌকা
চলে পানির চাপের জন্যইতো। বিশাল অট্টালিকার ছাদে পানির ট্যাংক বসানো হয়, এখানে পানি তুলতে
হয় আবার প্রয়োজনে প্রত্যেক তলায় পানি নামিয়ে আনতে হয়। আমাদের রোগ ব্যাধির চিকিৎসার জন্য
মাংসপেশী বা রক্তনালীর মধ্যে তরল ওষুধ ইনজেকশন দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে তরল
পদার্থের চাপকেই কাজে লাগানো হয়। তাই তরল পদার্থের চাপ আমাদের বাসতব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ। এ
অধ্যায়ে তরল পদার্থের চাপ, এ সম্বন্ধীয় সূত্র এবং ব্যবহারিক কিছু প্রয়োগ উল্লেখ করা হয়েছে। যা
আমাদের প্রত্যেকের জানা প্রয়োজন।
- তরল পদার্থের চাপ ও এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।
- প্যাসকেলের সূত্রের প্রয়োগ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।
- দৈনন্দিন জীবনে তরল পদার্থের চাপের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।
এ অধ্যায়ের পাঠ দিতে ম্যানোমিটার এবং ছিদ্র করা কয়েকটি রাবারের ছোট বল লাগবে। আপনার
স্কুলের ল্যাবরেটরিতে ম্যানোমিটার না থাকলে পরিশিষ্ট ২.১-এর বর্ণনা মোতাবেক বিকল্প যন্ত্র তৈরি
করে নিন। এটি কেমন কাজ করে তা আগে যাচাই করে নেবেন। রাবার বল ছিদ্র করা বেশ কঠিন
কাজ শিক্ষার্থীদের এ কাজ দেয়ার আগে নিজে কৌশলটি অভ্যাস করে নিন।
পাঠ-১ ঃ তরল পদার্থের চাপ ও তার বৈশিষ্ট্য ........................................... ৪০ মি.- তরল পদার্থের চাপ আছে বলতে পারবে।
- তরল পদার্থের চাপের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে পারবে।
- ম্যানোমিটারের সাহায্যে তরলের উর্ধ্বচাপ, নিমড়বচাপ ও পার্শ্বচাপ প্রমাণ করতে পারবে।
- তরলের গভীরতার সাথে চাপ বাড়ে ব্যাখ্যা করতে পারবে।
- প্রতি দলের জন্য একটি করে প্লাস্টিকের পরিত্যক্ত পানির বোতল, লোহার তারকাঁটা, হাতুড়ী,
গামলা বা পানি ধরার পাত্র, মোম বাতি, দিয়াশলাই এবং প্রয়োজনমতো পানি।
- একটি ম্যানোমিটার (পরিশিষ্ট ২.১-এর প্রস'ত প্রণালী অনুসরণ করে বিকল্প যন্ত্র তৈরি করে নিন)
- পরিমাণ মত পানিসহ একটি বালতি বা বড় কাচের পাত্র (একটি ৫/৮ লিটার প্লাস্টিকের পরিত্যক্ত
তেলের ক্যানের উপরের অংশ কেটে ফেলে পাত্র তৈরি করতে পারেন)।
- প্রশেড়বাত্তর, প্রদর্শন, পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, দলীয় কাজ ।
শিক্ষণ-শিখন কার্যাবলি
শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করে কুশল বিনিময় এবং বাড়ির কাজ আদায় করুন। একজন শিক্ষার্থীকে বইখাতাসহ
একটি ব্যাগ কাধে নিয়ে হাঁটতে বলুন, আবার খালি ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে বলুন এবার জিজ্ঞেস করুন কাধে কি
রকম লাগছে এবং এই দুটি কাজের মধ্যে অনুভূতির পার্থক্য কি? বই, খাতা থাকলে ওজন বা চাপ অনুভূত
হচ্ছে কিনা? বই, খাতা, ব্যাগ এগুলো পদার্থ। পদার্থের ওজন আছে এবং চাপ দেয়। তরল পদার্থের কি
ওজন আছে? । তরল পদার্থের কি কোন চাপ আছে? তাদের উত্তর শুনুন এবং উত্তরের সূত্র ধরে আজকের
পাঠ ঘোষণা করুন। বোর্ডে পাঠ শিরোনাম লিখুন (তরল পদার্থের চাপ ও তার বৈশিষ্ট্য)।
বলুন, যেহেতু তরল পদার্থের ওজন আছে তাই তরল পদার্থ চাপ প্রয়োগ করে। তরল পদার্থের চাপের
সংজ্ঞা বুঝিয়ে বলুন এবং একক ক্ষেত্রফল বলতে ১ বর্গ সে.মি. বা ১ বর্গ মিটার ক্ষেত্রফলকে বোঝায় তা
ব্যাখ্যা করুন।
এরপর শিক্ষার্থীদের কাছে তরল পদার্থের চাপের বৈশিষ্ট্য জানতে চান, তরল পদার্থ কোন্ কোন্ দিকে চাপ
দেয়। সঠিক উত্তর পেলে গ্রহণ করুন অথবা আপনি বলে দিন।
শিক্ষার্থীদের প্রশড়ব করুন বিভিনড়ব গভীরতায় তরলের বা পানির চাপ কি অভিনড়ব? কীভাবে বুঝবে? তাদের উত্তর শুনুন এবং সঠিক উত্তর পেলে গ্রহণ করে বলুন, এ প্রশেড়বর উত্তর আমরা খুব সহজ একটি পরীক্ষার মাধ্যমে
পেতে পারি।
শিক্ষার্থীদের ৫-৬ জন নিয়ে দল গঠন করুন। প্রত্যেক দলকে একটি করে প্লাস্টিকের বোতল, তারকাঁটা,
হাতুড়ী, মোমবাতি ও দিয়াশলাই সরবরাহ করুন। এবং একটি একটি করে নিমড়বরূপ নির্দেশ দিন।
- একটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পানির বোতল নিয়ে লোহার তারকাঁটা দিয়ে একই রেখা বরাবর
খাড়াভাবে বোতলের গায়ে বিভিনড়ব উচ্চতায় তিনটি ছিদ্র করতে বলুন।
- ছিদ্রগুলো মোম দিয়ে বন্ধ করে বোতলটি পানি দিয়ে ভর্তি কর। বোতলটি টেবিলের ওপর রাখ
যেন ছিদ্র দিয়ে পানি পড়লে তা নিচে রাখা গামলায় পড়ে। পানি যাতে মেঝে ভিজিয়ে না দেয় এজন্য
পানির ধারা বরাবর গামলা রাখ। এরপর বোতলের মুখটি খুলে দাও এবং মোমগুলো তুলে বোতলের
গায়ের ছিদ্রগুলো খুলে দাও।
এবার শিক্ষার্থীদের নীচের প্রশড়বগুলোর উত্তর দিতে বলুন।
- ক) সবগুলো ছিদ্র দিয়ে কি একই বেগে পানি বের হচ্ছে ?
- খ) কোন ছিদ্র দিয়ে পানি কম বেগে বের হয়ে আসছে?
- গ) কোন্ ছিদ্রের পানি বোতলের সবচেয়ে কাছে পড়ছে?
- ঘ) উপরের ঘটনাগুলো কেন ঘটছে বলে তুমি মনে কর?
- ঙ) এই পরীক্ষাটি থেকে প্রাপ্ত তথ্য আমরা জীবনে কোন্ কোন্
ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারি।
আপনি শিক্ষার্থীদের ম্যানোমিটারটি প্রদর্শন করুন। এর বিভিনড়ব অঙ্গ সমূহের পরিচয় দিন। এটি কিভাবে
কাজ করে শিক্ষার্থীদের তা প্রদর্শন করুন। ম্যানোমিটারে সঙ্গে যুক্ত ফানেলের পর্দায় আঙ্গুলের চাপ দিয়ে
প্রদর্শন করুন ট নলের তরলের তল কিভাবে ওঠা-নামা করে। এবং চাপের সঙ্গে দুই বাহুর তরলের
উচ্চতার পার্থক্যের সম্পর্ক কী হয়। (চাপ বাড়লে পার্থক্য বাড়ে)।
বড় কাচের পাত্রটি (অথবা বালতিটি) পানি পূর্ণ করুন, এর মধ্যে ম্যানোমিটারের সঙ্গে যুক্ত ফানেলটি
ডুবিয়ে দিন। ফানেলটির মুখ সোজা নিচের দিকে রেখে আসেত আসেত গভীরে ডুবাতে থাকুন এবং
শিক্ষার্থীদের ম্যানোমিটারের দুই বাহুর পানির পার্থক্য লক্ষ্য করতে বলুন। শিক্ষার্থীদের প্রশড়ব করুন-
- – U নলের পানির উচ্চতা কি একই স'ানে থাকছে?
- – পার্থক্য কমছে না বাড়ছে?
- – দুই বাহুর মধ্যে পানির উচ্চতার পার্থক্য কত?
- – দুই বাহুর মধ্যে পানির উচ্চতার পার্থক্যের কারণ কি?
ফানেলের মুখ ঊর্ধমুখী করে পানির তলা থেকে ফানেলটি আস্তে আস্তে উপরে তুলুন। শিক্ষার্থীদের
ম্যানোমিটারের দুই বাহুর পানির পার্থক্য লক্ষ করতে বলুন। পার্থক্য কমছে না বাড়ছে?
এথেকে কি সিদ্ধানত নেয়া যাবে? শিক্ষার্থীদের সিদ্ধানত গঠনে সাহায্য করুন। (গভীরতা বাড়লে চাপ
বাড়ে গভীরতা কমলে চাপ কমে)।
এবার ফানেলের মুখটি ‘পাত্রের দেয়ালের দিকে মুখ করে এবং পানির মধ্যে একই গভীরতায় রেখে
ফানেলটি ঘুরাতে থাকুন। ম্যানোমিটারের পাঠ লক্ষ্য করুন। কোন পরিবর্তন হচ্ছে কি?
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করুন,
- – এখন নলের পানির উচ্চতার কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা?
- – এই ঘটনাটি কেন ঘটছে?
ফানেলটিকে পানির আরো গভীরে নিয়ে U নলের দুই বাহুর মধ্যে পানির উচ্চতা লক্ষ্য করতে হবে। এখন
ঐ গভীরতার রেখে ফানেলটির মুখ ডানে, বামে উপরে বা অন্য কোন দিকে ঘোরাতে হবে। শিক্ষার্থীদের
প্রশড়ব করুন,
- – এ ক্ষেত্রে ম্যানোমিটারের দুই বাহুর তরলের উচ্চতার কোন পার্থক্য আছে কি?
- – এই ঘটনাটি কেন ঘটছে?
শিক্ষার্থীদের উত্তর শুনুন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করুন। (একই উচ্চতায় পানির সর্বমুখী চাপ সমান
থাকে)।
এই পরীক্ষা থেকে আমরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পেলাম। শিক্ষার্থীদের স্মরণ করতে এবং খাতায়
লিখতে বলুন।
এবার খাতা দেখে পড়তে বলুন। প্রয়োজন হলে সংশোধন করে দিন।
আপনার বিদ্যালয়ে যদি ম্যানোমিটার না থাকে তবে নীচের ভিডিও ক্লিপ অনুসরণ করে ম্যানোমিটির বানাতে পারেন-
- ১. তরলের চাপ বলতে কী বুঝায়?
- ২. তরল পদার্থের চাপের বৈশিষ্ট্য কী কী?
- ৩. গভীরতা বাড়লে চাপ বাড়ে না কমে?
- ৪. গভীরতা কমলে চাপ কমে না বাড়ে?
- ৫. তরল পদার্থের গভীরতার সাথে চাপের সম্পর্ক কি?
- ৬. একই গভীরতায় রেখে ফানেলটির মুখ সবদিক ঘুরালে তরলের উচ্চতার কোন পরিবর্তন হয় না
কেন?
- ৭. তরল পদার্থ কোন্ দিকে চাপ দেয়?
- ৮. সি'র তরল কোন্ কোন্ দিকে চাপ দেয়?
- ৯. চাপ মাপার যন্ত্রের নাম কী?
- ১০.তরল পদার্থের চাপ মাপার যন্ত্রের নাম কী?
নদী বা খালে পানি আটকানোর জন্য যে বাঁধ তৈরি করা হয় সেটির নিচের অংশ উপরের অংশের চেয়ে বেশি চওড়া করা হয় কেন? যুক্তি দাও।
- তরল পদার্থ চাপ দেয়।
- তরল পদার্থ সবদিকে অর্থাৎ নিমড়বমুখী, ঊর্ধ্বমুখী এবং পার্শ্বচাপ দেয়।
- তরলের মধ্যে কোন বিন্দুতে চাপ তরলের উপরি তল থেকে ঐ বিন্দুর গভীরতার উপর নির্ভর করে।
- গভীরতা যত বাড়ে চাপ তত বাড়ে।
- একই গভীরতায় তরলের সর্বমুখী চাপ সমান থাকে।
শিখনফল
- প্যাসকেলের সূত্রের বর্ণনা দিতে পারবে।
- প্যাসকেলের সূত্রের পরীক্ষামূলক প্রমাণ বর্ণনা করতে পারবে।
- প্রত্যেক দলের জন্য একটি করে ছোট রাবারের বল (হাতের মুঠোয় নেয়া যায় এমন)
- ছিদ্র করার জন্য বড় ও মোটা সুই
- ছিদ্র করার জন্য মোম
- পানি প্রয়োজনমতো।
প্রশেড়বাত্তর, প্রদর্শন, দলীয়কাজ
শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করে কুশল বিনিময় এবং বাড়ির কাজ আদায় করে একজন শিক্ষার্থীর হাতে পানি ভর্তি
একটি বল দিয়ে চাপ দিতে বলুন। পানি চতুর্দিকে বের হতে থাকবে। প্রশড়ব করুন সবদিকে পানি সমানভাবে
বের হচ্ছে কি? এভাবে পানি বের হয় কেন? চাপ বেশি হলে পানি বেশি বের হয় কি? এভাবে প্রশেড়বাত্তরের
পর্যায়ে বলুন তরল পদার্থের উপর চাপ সম্পর্কে বিজ্ঞানী প্যাসকেল একটি সূত্র আবিষ্কার করেছেন। এসো
আজ আমরা প্যাসকেলের সূত্রটি এবং এর ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করি। এভাবে আজকের পাঠ ঘোষণা
করুন।
প্রথমে প্যাসকেলের সূত্রটি বর্ণনা করুন এবং বোর্ডে লিখুন। এবার বোর্ডে একটি ছবি এঁকে তা ব্যাখ্যা
করুন। শিক্ষার্থীদের বলুন প্যাসকেল উল্লেখ করেছেন তরল সবদিকে সমানভাবে চাপ দেয়। একথা সত্য
কি? এস আমরা আজ পরীক্ষা করে দেখি।
পরীক্ষাটি করার পূর্বে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কয়েকটি দল গঠন করুন। হাতের মুঠোয় নেয়া যায় এমন ছোট
বল দিন। তবে এর মধ্যে একটু ছোট ও বড় সাইজ দেখে নিলে ভাল হয়। তাহলে শিক্ষার্থীরা পানির চাপ
সবদিকে সমান এবং সাইজের উপর নির্ভর করে কি না বুঝতে পারবে।